লুসিড ড্রিমিং কী এবং এটি মানসিক স্বাস্থ্যে কীভাবে প্রভাব ফেলে? জেনে নিন স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য উপকারিতা, দুঃস্বপ্ন মোকাবিলা, সৃজনশীলতা বৃদ্ধি এবং ঘুমের ব্যাঘাতসহ এর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে।
প্রথমেই লুসিড ড্রিমিং কি তা জেনে নেয়া যাক। না এর থেকে ভালো হয় চলুন লুসিড ড্রিমিং এক্সপেরিয়েন্স করা যাক।
তো ঘুমিয়ে পড়ুন তাহলে। গভীর ঘুমে হারিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।আপনার ব্রেইন সারাদিনের দেখা বিষয়গুলো লং টার্ম মেমোরিতে স্টোর করা শুরু করেছে এবং আপনি স্বপ্নের জগতে পদার্পণ করেছেন।
ঠিক তখনই আপনি সচেতন হয়ে গেলেন এবং বুঝতে পারছেন যা দেখছেন সেগুলো স্বপ্ন, বাস্তবে আপনার সামনে সেই ঘটনাগুলো ঘটছে না।আপনি যেহেতু বুঝতে পেরেছেন যে আপনি স্বপ্ন দেখছেন এখন আপনি ঘুম থেকে জাগার চেষ্টা না করে স্বপ্নে দেখা সেই ঘটনাগুলোকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং আপনার ইচ্ছামতো সেই ঘটনাগুলো আপনার সামনে প্রদর্শিত হচ্ছে।
এই যে আপনি নিজের স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন এই বিষয়টারই পোশাকি নাম লুসিড ড্রিমিং(Lucid Dreaming) এবং আপনার এই ঘুমন্ত অবস্থাটাকে বলা হয় REM(Rapid Eye Movement)। এবার যারা এই লুসিড ড্রিমিং নিয়মিত চর্চা করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাবটা কি হবে তা জেনে নেয়া যাক।
ইতিবাচক প্রভাব দিয়ে শুরু করছি, প্রথমেই দুঃস্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের কথা বলতে হয়। যেহেতু লুসিড ড্রিমিং-এ স্বপ্নে দেখা ঘটনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তাই স্বপ্নের খারাপ কিংবা ভীতিকর পরিস্থিতিকেও ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। এতে আপনার দুঃস্বপ্নের অভিজ্ঞতা লাভ করতে হলো না। দুঃস্বপ্ন কারণে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, অনিদ্রা এবং নিদ্রাজনিত ব্যাধি যেমন নার্কোলেপসি দেখা দিতে পারে। এছাড়া পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার(PTSD)-এর রোগীদের রোগ নিরাময়ের জন্য লুসিড ড্রিম থেরাপি (LDT) কিছুটা সহায়তা করে।
লুসিড ড্রিমিং-এর মাধ্যমে যেহেতু স্বপ্নে ঘটনাগুলোকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করে আপনার কোনো অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করতে পারবেন তাই এর মাধ্যমে আপনার মন মেজাজ বেশ ভালো থাকারও সম্ভাবনা রয়েছে। লুসিড ড্রিমিং আপনার সৃজনশীলতা ও কল্পনাশক্তিকে আরো বৃদ্ধি করতে পারে, তবে বিষয়টি এখনো বৈজ্ঞানিক ভাবে প্রমানিত হয়নি। সাধারণত ধারণা করা হয় যে সৃজনশীল ব্যক্তিরাই লুসিড ড্রিমিং করতে পারে। কিন্তু লুসিড ড্রিমিং করা ব্যক্তিরাই বলছে যে লুসিড ড্রিমিং এর মাধ্যমে তাদের সৃজনশীলতা আগের থেকে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়াও লুসিড ড্রিমিং মোটর স্কিল বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।মোটর স্কিল মস্তিষ্কের সেন্সরিমোটর কর্টেক্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। মস্তিষ্কের এই অংশ আপনার শারীরিক নড়াচড়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।যারা শারীরিক প্রতিবন্ধী তারা লুসিড ড্রিমিং-এর মাধ্যমে মস্তিষ্কের সেন্সরিমোটর কর্টেক্সকে কিছুটা সক্রিয় করতে পারে যার ফলে শরীরের যে নিষ্ক্রিয় অংশ নিষ্ক্রিয় সেগুলোরও সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।সেই সাথে যারা খেলাধূলার সাথে জড়িত তাদেরও শারীরিক উন্নতিতে সহায়তা প্রদান করে থাকে এই লুসিড ড্রিমিং।
এবার নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে বলা যাক। 2020 সালের একটি ভার্চুয়াল সমীক্ষায় দেখা গেছে যে,অনেক লুসিড ড্রিমার তাদের দুঃস্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে এবং স্বপ্ন থেকে জেগে উঠতে না পেরে তারা সেই দুঃস্বপ্নের মধ্যেই আটকা পড়ে যায়। যেটাকে বলা হয় লুসিড নাইটমেয়ার (Lucid Nightmare)। এতে মানসিকভাবে বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
লুসিড ড্রিমিং-এর ফলে ঘুমের পরিমাণ কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।যার ফলে সারাদিন শারীরিক ক্লান্তি, বিরক্তি ভাব থাকে। এছাড়াও কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে ব্রেইনে কনফিউশন সৃষ্টি হতে পারে।সেই সাথে অন্যদের থেকে নিজেকে দূরে রাখার প্রবণতাও রয়েছে লুসিড ড্রিমারদের মধ্যে।এছাড়াও বাস্তব ও স্বপ্নের কাল্পনিকতার মধ্যে পার্থক্য করতে সমস্যা হয়।এই সকল কারণে লুসিড ড্রিমারদের মধ্যে সাবক্লিনিকাল সাইকোসিসে আক্রান্ত হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
কিছু কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিকভাবে দুর্বলদের জন্য লুসিড ড্রিমিং মারাত্মক হতে পারে। 2018 সালের করা 187 জন লুসিড ড্রিমার শিক্ষার্থীর মধ্যে করা গবেষণায় দেখা গেছে তারা বাস্তব ও কাল্পনিকতাকে গুলিয়ে ফেলে এবং তাদের মধ্যে অন্যদের থেকে বিছিন্ন থাকার প্রবণতা ও পার্সোনাল ডিজঅর্ডার দেখা যায়।
গবেষকরা লুসিড ড্রিমিং সম্পর্কে বলেছেন যে, লুসিড ড্রিমিং এর প্রভাব আপেক্ষিক। মানসিক স্থিতিশীলতার বৈশিষ্ট্য অনুসারে ভিন্ন ব্যক্তির উপর এর প্রভাব ভিন্ন হবে। তাই লুসিড ড্রিমিং-এ গুটিকয়েক ব্যক্তি নিয়ে করা গবেষণার উপর ভিত্তি করেই সেটার শুধুই ইতিবাচক কিংবা শুধুই নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে বলা যাবে না। এর জন্য আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
সোর্স: