Back to BlogHealth & Medicine
Jul 22, 202323 min readUpdated Oct 11, 2026

বিড়াল থেকে কি কি রোগ ছড়াতে পারে ও কিভাবে তা প্রতিরোধ করবেন

বিড়ালের লালা, কামড়, আঁচড় কিংবা মলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে কী কী রোগ ছড়াতে পারে? জেনে নিন ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ, টক্সোপ্লাজমোসিস, জলাতঙ্কসহ বিভিন্ন জুনোটিক রোগের লক্ষণ, সংক্রমণের উপায় এবং বিড়াল থেকে রোগ ছড়ানো প্রতিরোধের কার্যকর পদ্ধতি।

বিড়ালের রোগ,জুনোটিক রোগজলাতঙ্ক

বিড়াল নিয়ে কিছুদিন ধরে বেশ হৈচৈ হচ্ছে। কেউ কেউ দাবি করছে বিড়াল লালায় জীবাণু থাকে না তাই এক থালায় খাবার খেলে সমস্যা নেই, আবার কেউ বলছে বিড়ালের মাধ্যমে কোন রোগ ছড়ায় না এই ধরনের কথাবার্তা। যাইহোক এই আর্টিকেলে আমরা জানার চেষ্টা করবো যে বিড়াল থেকে কি কি রোগ ছড়াতে পারে।

শুরুতেই বিড়ালের ভ্যাকসিন নিয়ে কিছু কনসেপ্ট ক্লিয়ার করা প্রয়োজন,

অনেকে মনে করে 'ভ্যাক্সিনেটেড বিড়াল থেকে রোগ ছড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই' এই কথাটি সম্পূর্ণ সত্য নয়। মূলত বিড়ালকে নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন দেয়া হয়।যেমন: কোনো বিড়ালকে রেবিস ভ্যাকসিন দেয়া হলে সেই বিড়ালের র‍্যাবিসে আক্রান্ত হ‌ওয়ার ঝুঁকি কম থাকবে তবে একদম‌ই রেবিসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই এরকম বলা যাবে না।[1]

আরেকটু সহজ করে বলি, বিড়ালের এই ভ্যাকসিনের ব্যাপারটা অনেকটা আমাদের দেশের শিশুদের জন্মের পর টিকা দেয়ার মতো। বাচ্চাদের জন্মের পর যেমন কয়েক ধরনের ভ্যাকসিন বা টিকা দেয়া হয় যেমন পোলিও, যক্ষ্মার টিকা ইত্যাদি, এতে এই রোগগুলোতে আক্রান্ত হ‌ওয়ায় সম্ভাবনা কমে। তেমনি বিড়ালরেও কয়েকটা রোগের ভ্যাকসিন বা টিকা দেওয়া লাগে। মানুষের যেমন ঐ টিকা দেয়া রোগ ছাড়া অন্য রোগ হতে পারে বিড়ালে‌র‌ও তেমনি অন্য রোগ হতে পারে।

বিড়ালের বয়স, জীবনধারা ও সার্বিক স্বাস্থ্য বিবেচনা করে বিড়ালকে সেই অনুযায়ী ভ্যাকসিন দেয়া হয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিড়ালকে সাধারণত তিন ধরনের ভ্যাকসিন দেয়া হয়।

  • FVRCP: এটিকে Feline Distemper Vaccine নামেও ডাকা হয়।এফভিআরসিপি এর পূর্ণরূপ হচ্ছে ফেলাইন ভাইরাস রাইনোট্রাকাইটিস, ক্যালিসিভাইরাস এন্ড প্যানলিউকোপেনিয়া। বুঝতেই পারছেন এই ভ্যাকসিনে বিড়ালের তিনটি রোগ হ‌ওয়ার সম্ভাবনা কমে। যেমন: রাইনোট্রাকাইটিস (Rhinotracheitis), ক্যালিসিভাইরাস(Calicivirus), প্যানলিউকোপেনিয়া (Panleukopenia)।
  • র‍্যাবিস (Rabies) বা জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন
  • ফেলাইন লিউকেমিয়া ভ্যাকসিন (Feline Leukemia)

এই ভ্যাকসিন গুলোর মাধ্যমে বিড়ালের কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হ‌ওয়ায় সম্ভাবনা কম। বিড়ালের যদি অন্য রোগে আক্রান্ত হ‌ওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা যদি অন্য রোগে আক্রান্ত হয় তখন বিড়ালকে সেই রোগের ভ্যাকসিন দিতে হবে।

বিড়ালের ভ্যাক্সিন দেয়ার সময়কাল আপেক্ষিক। এটি সম্পূর্ণ বিড়ালের উপর নির্ভর করছে। ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শে অনুসারে বিড়ালকে ভ্যাক্সিন দেওয়া উচিত। বিড়াল ছানা ও প্রাপ্তবয়স্ক বিড়ালের ভ্যাক্সিন দেয়ার সময়কাল আলাদা হয়। সাধারণত বিড়াল ছানার বয়স ৬-৮ সপ্তাহ হলে ভ্যাক্সিন দেয়া শুরু হয় এবং ১৬ সপ্তাহ বয়স পর্যন্ত বিড়ালছানাকে ভ্যাকসিন দেয়া হয়। এটা মূলত ভ্যাকসিনের কিটেন সিরিজ।[1,2]

এই সিরিজ শেষ হওয়ার এক বছর পর বিড়াল প্রাপ্তবয়স্ক হলে তখন আবার ভ্যাকসিন দিতে হয়। এরপর থেকে প্রতি এক/তিন বছর পর পর ভ্যাকসিন দিতে হয়, এটি ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা ও বিড়ালের সার্বিক স্বাস্থ্যের উপর নির্ভর করছে।এখানে উল্লেখ্য ভ্যাক্সিন দেয়ার পর বিড়ালের মধ্যে সাময়িক কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।[1]

মূল আর্টিকেলে যাওয়ার পূর্বেই বলে নিচ্ছি, উপরে যে তিন ধরনের ভ্যাকসিন ও রোগ উল্লেখ করেছি ওগুলো ছাড়া আর কি কি রোগ হতে পারে সে সম্পর্কে বলা হবে। যেহেতু বেশিরভাগ বিড়ালকে এই তিন ধরনের ভ্যাকসিন দেয়া হয় তাই এই রোগ গুলোতে আক্রান্তের ও সংক্রমণের ঝুঁকি কম। সাধারণত বিড়ালকে যে রোগের ভ্যাকসিন দেয়া হয় না সেই রোগ গুলো নিয়েই আর্টিকেলে আলোচনা করা হবে।

সাধারণত বিড়াল ঘটিত রোগ গুলো বা Feline Infectious Diseases বিড়াল থেকে বিড়ালে সংক্রমিত হয়। রোগ যদি বিড়াল বা যেকোনো প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয় তবে সেটিকে জুনোটিক রোগ বলে।

এখানে বলে রাখি, একজন সুস্থ স্বাভাবিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে জুনোটিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবে শিশু, ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি সিন্ড্রোম বা এইডস এবং ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তিরা ও যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের জন্য জুনোটিক রোগ মারাত্মক। এই ধরনের ব্যক্তিরা জুনোটিক রোগে আক্রান্ত হলে তাদের ইমিউন সিস্টেম আরো দুর্বল হয়ে পড়ে।

ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ

বিড়াল থেকে সংক্রমিত হওয়া জুনোটিক রোগ সম্পর্কে বলবো। প্রথমেই বলতে হয় ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (CSD) নিয়ে, নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এটি ক্ষতের মাধ্যমে ছড়ায়। সিএসডি সাধারণত বর্তনেলা হেনসেলে (Bartonella henselae) নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয় থাকে। এই ব্যাকটেরিয়া সাধারণত সংক্রামিত বিড়ালের লালার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে।

হয়তো মনে প্রশ্ন আসতে পারে এই ব্যাকটেরিয়া বিড়ালের লালায় কিভাবে আসে? সাধারণত ক্যাট ফ্লি'র মাধ্যমে বিড়ালের মধ্যে এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। ক্যাট ফ্লি হলো এক ধরনের পোকা/মাছি যারা বিড়াল, মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে এবং এই ফ্লি বা মাছি নিজের দেহে বর্তনেলা হেনসেল নাম ব্যাকটেরিয়া বহন করে।

আপনি জেনে অবাক হবেন বিশ্বের ৪০% বিড়াল এই বর্তনেলা হেনসেল ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা সংক্রামিত তবে বেশিরভাগ বিড়ালের‌ই রোগের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না। এবার মানুষ মধ্যে সি‌এসডি কিভাবে ছড়ায় তা জানা যাক। কোনো ব্যক্তির ক্ষত স্থানে যখন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত বিড়াল লেহন বা কামড় দেয় তখন বিড়ালের লালার মাধ্যমে ঐ ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত হয় এবং এর থেকেই ঐ ব্যক্তি সিএসডিতে আক্রান্ত হয়।

কিভাবে বুঝবেন যে ঐ ব্যক্তি সিএসডি আক্রান্ত কি না? চলুন সিএসডির লক্ষণ সম্পর্কে জানি।

আক্রান্ত ব্যক্তির ক্ষতস্থানে ফোলা ভাব এবং ফোস্কা দেখা দিতে পারে। ক্ষতস্থানের লিম্ফনোড গুলো ফুলে যেতে পারে এবং সেটা বেদনাদায়ক হতে পারে। লিম্ফনোড মূলত হচ্ছে আমাদের লিম্ফ্যাটিক সিস্টেমের অঙ্গ যা আমাদের পুরো শরীর জুড়ে বিস্তৃত থাকে।

এছাড়াও সিএসডি আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, পেশী ও জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধি গুলোতে ব্যথা এবং ক্ষুধামন্দা দেখা দিতে পারে। যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল তাদের ক্ষেত্রে চোখ, মস্তিষ্ক এবং হার্টে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে বিড়াল যাতে কোনো ক্ষতস্থান বা ত্বকে কামড় অথবা আঁচড় দিতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিড়ালকে ঘরে রাখা, বিড়ালের সাথে খেলার পর নিজের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ফ্লি/মাছি নিয়ন্ত্রণ করা এবং শিশুদের বিড়ালের সাথে খেলতে না দেয়া অথবা খেলার সময় সতর্ক থাকা ইত্যাদি কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে সিএসডি এড়ানো সম্ভব।

পাসটিউরেলা মালটোসিডা সংক্রমণ

পাসটিউরেলা মালটোসিডা মূলত এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া যা প্রায় ৭০-৯০ শতাংশ বিড়ালের মুখে‌ই থাকে এবং বিড়ালের কামড়ের ফলে রোগাক্রান্ত মানুষের ৫০-৮০ শতাংশ‌‌ই এই ব্যাকটেরিয়ার ফলে আক্রান্ত হয়।

সাধারণত এই ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত বিড়ালের কামড়ের 24 থেকে 48 ঘন্টার মধ্যে ক্ষতস্থানে ব্যথা, ফোলা ভাব এবং লালভাব দেখা যায়। তবে বিরল ক্ষেত্রে এই ব্যাকটেরিয়া রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং হার্টের ভালভ সংক্রমিত হতে পারে। সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপির মাধ্যমে এই রোগের চিকিৎসা করা হয়। তবে বিরল ক্ষেত্রে ভিন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা নেয়া হয়।

সালমোনেলোসিস বা সালমোনেলা পয়জনিং

সালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়ার কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। সাধারণত দূষিত খাবার যেমন রান্না না করা মুরগি বা ডিম খেলে আক্রান্ত হয় তবে সালমোনেলা সংক্রমিত বিড়াল ও বিড়ালের মল থেকেও এই রোগ ছড়াতে পারে। কোনো বিড়াল যদি কাঁচা মাংস, বন্য পাখি বা প্রাণী খায় তবে সালমোনেলা সংক্রমিত হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের এক থেকে তিন দিন পরে ডায়রিয়া, জ্বর এবং পেটে ব্যথা হতে পারে। সাধারণত সালমোনেলোসিস কোনো ধরণের চিকিৎসা ছাড়াই আপনা আপনি সেরে যায়। তবে কখনো কখনো ডায়রিয়া বা কিছু অঙ্গতে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের প্রভাব দেখা যায়, সেক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

সালমোনেলা সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে বিড়াল ঘরে রাখতে হবে, রান্না করা খাবার অথবা বাণিজ্যিক ভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে হবে। এছাড়াও লিটার বক্স ও বিড়ালের মল পরিষ্কার করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করতে হবে এবং পরিষ্কারের পর ভালোভাবে হাত ধুতে হবে।

পরজীবী দ্বারা কোন কোন জুনোটিক রোগ ছড়ায় তা সম্পর্কে জানা যাক

ফ্লি

জুনোটিক রোগ সংক্রমণের সবচেয়ে সাধারণ পরজীবী হচ্ছে ফ্লি (Fleas)। ফ্লি সিএসডিসহ অন্যান্য জুনোটিক রোগের বাহক হিসেবে কাজ করে।

এই ফ্লি বা ক্যাট ফ্লি মানুষ বা বিড়ালের দেহে চুলকানি ও প্রদাহ সৃষ্টি করে। এছাড়াও বিড়াল যদি কখনো ফ্লি ফেলে তাহলে টেপ‌ওয়ার্ম বা ফিতাকৃমির দ্বারা সংক্রামিত হতে পারে। কখনো কখনো মানুষ‌ও ভুলবশত ফ্লি খেয়ে ফেললে টেপ‌ওয়ার্ম দ্বারা সংক্রামিত হতে পারে।

স্ক্যাবিস

স্ক্যাবিস হচ্ছে এক ধরণের চর্মরোগ। যা সারকোপটেস স্ক্যাবিই নামক পরজীবীর মাধ্যমে ছড়ায়। এটি বিড়ালের ত্বকে বসবাসকারী এক ধরনের বাহ্যিক পরজীবী যা জুনোটিক রোগ সৃষ্টি করে। স্ক্যাবিস বিড়ালের ত্বক থেকে মানুষের ত্বকে ছড়াতে পারে এবং ত্বকের মধ্যে ক্ষত ও চুলকানি সৃষ্টি করতে পারে।

বিড়ালের অন্ত্রের পরজীবী থেকে সৃষ্ট রোগ সম্পর্কে জানা যাক যেগুলোতে মানুষ‌ও আক্রান্ত হতে পারে।বিড়ালের অন্ত্রের পরজীবীর মধ্যে গোলকৃমি (Roundworm), বক্রকৃমি (Hookworm) উল্লেখ্য। এই পরজীবীদের যথাক্রমে টক্সোকারা (Toxocara) ও অ্যানসাইলোস্টোমা (Ancylostoma) বলা হয়।

সাধারণত বিড়ালের মল দ্বারা দূষিত মাটি থেকে এই পরজীবী শিশুদের দেহে প্রবেশ করতে পারে। তবে বিড়ালের অন্ত্রের পরজীবী মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হওয়ার পরেও বেশিরভাগ ব্যক্তির মধ্যে রোগের কোন লক্ষণ প্রকাশ পায় না, আবার অনেকের মধ্যে রোগাক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।

ভিসারাল লার্ভা মাইগ্রান (Visceral larvae migrans)

এটি এক ধরনের মারাত্মক রোগ যা মানুষের দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। টক্সোকারা লার্ভা (Toxocara larvae) থেকে এই রোগের সৃষ্টি হয়ে থাকে। টক্সোকারা লার্ভা দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করলে লিভার, পাকস্থলী এমনকি কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র অর্থাৎ মস্তিষ্কেও স্থানান্তরিত হতে পারে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিড়ালের মল অথবা মল দ্বারা দূষিত মাটি পরিষ্কার করার পর হাত ভালোভাবে না ধুয়ে মুখে আঙুল দিলে এই টক্সোকারা লার্ভা দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যার থেকে ভিসারাল লার্ভা মাইগ্রান রোগে হতে পারে। এ রোগের লক্ষণ গুলোর মধ্যে জ্বর, ক্লান্তি, কাশি, শ্বাসকষ্ট এবং পেটে ব্যথা উল্লেখযোগ্য।

ওকুলার লার্ভা মাইগ্রান (Ocular larvae migrans)

এই রোগের কারণ‌ও টক্সোকারা লার্ভা। টক্সোকারা লার্ভা যখন চোখের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তখন চোখে অস্বাভাবিক নড়াচড়া, চোখে ব্যথা, অস্বস্তি ও দেখতে অসুবিধা হয়।

কিউটেনিয়াস লার্ভা মাইগ্রান (Cutaneous larva migrans)

এটি চর্মরোগ যা অ্যানসাইলোস্টোমা লার্ভা থেকে হয়ে থাকে। এটিও অ্যানসাইলোস্টোমা লার্ভা দ্বারা দূষিত মাটির সংস্পর্শে আসলে লার্ভা ত্বকের মধ্যে প্রবেশ করে ত্বকে প্রদাহ, ব্যথা, চুলকানি ও ত্বকে লাল দাগ দেখা যেতে পারে।

ফাঙ্গাল ইনফেকশন

হ্যাঁ বিড়াল থেকে ফাঙ্গাল ইনফেকশন বা ছত্রাক সংক্রমণ‌ও হ‌ওয়া সম্ভব। সাধারণত ফাঙ্গাল ইনফেকশনের কারণে বিড়ালের মধ্যে ডার্মাটোফাইটোসিস দেখা যায়। যা খাঁটি বাংলায় দাদ নামে পরিচিত।

ফাঙ্গাল ইনফেক্টেড বিড়ালের ত্বক থেকে ছত্রাকের স্পোর মানুষের ত্বকে প্রবেশ করতে পারে এবং এই স্পোর বেশ কয়েক মাস ধরে ত্বকের নিচে সক্রিয় থাকতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের এই সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। তাই এই সব ক্ষেত্রে সংক্রামিত বিড়ালকে আলাদা ঘরের মধ্যে রাখতে হবে এবং চিকিৎসা দিতে হবে, যতদিন পর্যন্ত না সুস্থ হয়।

প্রোটোজোয়াল ইনফেকশন

প্রোটোজোয়া নামক এককোষী জীবের শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত কিছু পরজীবী কারণে এই ইনফেকশন হয়। সাধারণত বিড়াল থেকে মানুষের মধ্যে প্রোটোজোয়ান ইনফেকশনের কারণে তিন ধরনের রোগ বেশি দেখা যায়। যেমন: ক্রিপ্টোস্পোরিডিওসিস (Cryptosporidiosis), গিয়ার্ডিয়াসিস (Giardiasis) এবং টক্সোপ্লাজমোসিস (Toxoplasmosis)

প্রথমে ক্রিপ্টোস্পোরিডিওসিস নিয়ে বলি। ইনফেকশনের কারণে এই রোগ হলে বিড়াল এবং মানুষের মধ্যে ডায়রিয়া, বমি, জ্বর, পেটে ব্যথা এবং ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হতে পারে। ক্রিপ্টোস্পোরিডিয়াম পরজীবী দ্বারা সংক্রমিত বিড়ালের মলের সংস্পর্শে আসলে এই রোগ মানুষের মধ্যেও ছড়াতে পারে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের এই রোগের ঝুঁকি বেশি।

গিয়ার্ডিয়াসিস, এটি গিয়ার্ডিয়া (Giardia) নামক আণুবীক্ষণিক পরজীবীর কারণে এই রোগ হয়ে থাকে। তবে গিয়ার্ডিয়াসিস বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর মাধ্যমেও ছড়াতে পারে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিড়াল ছাড়া অন্য প্রাণীর মাধ্যমেই মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। প্রাণীর মল, দূষিত পানির উৎস এবং রান্না না করা খাবার থেকে মানুষ ও প্রাণীর মধ্যে ছড়াতে পারে।গিয়ার্ডিয়া সংক্রমণের উপসর্গের মধ্যে ডায়রিয়া, পেট ফাঁপা, পেট ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ডিহাইড্রেশন দেখা যায়।

টক্সোপ্লাজমোসিস সম্পর্কে বলা যাক। প্রোটোজোয়ান টক্সোপ্লাজমা গন্ডি পরজীবীর সংক্রমণে এই রোগ হয়ে থাকে। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং শিশু তাদের ক্ষেত্রে এই রোগ নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যে সকল মায়েরা গর্ভাবস্থায় থাকাকালীন সময়ে এই রোগের আক্রান্ত হয় তাদের শিশুদের‌ও এই রোগ হতে পারে।

সাধারণত বিড়াল যদি এই পরজীবী দ্বারা সংক্রামিত ইঁদুর খায়, পাখি অথবা অন্যান্য সংক্রামিত প্রাণীর মলের সংস্পর্শে গেলে বিড়ালের এই রোগ হতে পারে। আপনি জেনে অবাক হবেন টক্সোপ্লাজমোসিস আক্রান্ত বিড়াল দুই সপ্তাহ পর্যন্ত তার মলের মাধ্যমে পরজীবী দেহের বাইরে বের করতে পারে এবং ত্যাগকৃত মলের পরজীবীর সংক্রমণের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠতে এক থেকে পাঁচ দিনের মতো সময় লাগে।

যদিও বিড়ালের মলের মাধ্যমে টক্সোপ্লাজমা সংক্রমণ সম্ভব তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কম রান্না করা খাবার বা কাঁচা মাংস ও শাকসবজি খেয়ে, শাকসবজি থেকে দূষিত মাটি ভালোভাবে পরিষ্কার না করে খেলে টক্সোপ্লাজমায়

সংক্রমিত হয়। সাধারণত টক্সোপ্লাজমায় সংক্রমিত হলে এর উপসর্গের মধ্যে পেশী ব্যথা, জ্বর এবং মাথাব্যথা দেখা যায়। তবে খুব কম ক্ষেত্রে ডায়রিয়া, বমি, খিঁচুনি দেখা যায়।

র‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক

হ্যাঁ একদম ঠিক দেখছেন। জলাতঙ্ক শুধু কুকুরের কামড়ে হয় না। বিড়াল, বাদুড়, শেয়াল সহ অনেক প্রাণীর কামড়েই জলাতঙ্ক হতে পারে। জলাতঙ্ক রেবিস ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। রেবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কোনো প্রাণী যদি বিড়ালকে কামড়ায় তবে বিড়ালের‌‌ও হবে এবং সেই বিড়াল যদি ব্যক্তিকে কামড়ায় তবে সেই ব্যক্তির‌ও জলাতঙ্ক হবে। তাই এক্ষেত্রে বিড়ালকে আগে থেকেই ভ্যাকসিন দিতে হবে।

তো সম্পূর্ণ আর্টিকেল থেকে আমরা এটা বুঝতে পারলাম যে বিড়াল থেকে মানুষের মধ্যে মল, কামড় এবং লালা, ত্বক বা লোমের সংস্পর্শ এবং স্ক্র্যাচ বা ক্ষতের মাধ্যমে রোগ ছড়াতে পারে।[3]

কিভাবে বা কোন কোন পদক্ষেপ এই বিড়াল ঘটিত রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। চলুন জানা যাক।

  • খাওয়ার আগে এবং বিড়ালকে স্পর্শ করার পরে প্রতিবার হাত ধোয়া।
  • বিড়ালের মল ও স্বাস্থ্য নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
  • বিড়াল অসুস্থ ও আঘাতপ্রাপ্ত হলে সেই বিড়ালে চিকিৎসা সেবা দিতে হবে।
  • বিড়ালকে অবশ্যই নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে।
  • বিড়াল যাতে পরজীবী অথবা ফ্লি দ্বারা সংক্রমিত না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
  • আপনার নিজের ক্ষত স্থান, মুখ, খাবার ও খাবারের প্লেট বিড়ালকে চাটতে দেয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
  • বিড়ালকে অধিকাংশ সময় ঘরের মধ্যেই রাখা।
  • বিড়ালকে ভালোভাবে রান্না করা খাবার দেয়া অথবা বাণিজ্যিক ভাবে অনুমোদিত খাবার দেয়া।
  • প্রতিদিন লিটার বক্স থেকে বিড়ালের মল পরিষ্কার করতে হবে এবং নিয়মিত লিটার বক্স পরিষ্কার করতে হবে।
  • বিড়াল আঁচড় বা কামড় দিতে পারে এমন কোনো আচরণ বা কার্যকলাপ করা থেকে বিরত থাকা উচিত, বিশেষ করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।
  • যদি বাগানে শাকসবজি চাষ করা হয় এবং বিড়াল যদি বাগানে যায় তবে শাকসবজি রান্না করার আগে ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে এবং বাগানে কাজ করার সময় হাতে গ্লাভস পরতে হবে এবং কাজের পরে হাত-পা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
  • ব্যবহার করার পর শিশুদের স্যান্ডবক্স ঢেকে রাখুন যাতে বিড়াল সেখানে মল ত্যাগ করতে না পারে।
  • বিড়ালের মলের সংস্পর্শ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা।

আপনি যদি পোষা বিড়াল থেকে থাকে তবে এই বিষয়গুলো অবশ্য‌ই মেনে চলবেন।[3]

এবার বিড়াল সম্পর্কিত প্রচলিত কিছু দাবির সত্যতা যাচাই করা যাক।

দাবি: বিড়ালের মুখে বা লালায় কোন ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু নেই?

সত্যতা: পৃথিবীর সকল প্রাণীর মুখেই কোনো না কোনো ব্যাকটেরিয়া আছে, মানুষের মুখেও জীবাণু আছে। এখানে উল্লেখ্য জীবাণু মানেই সব ক্ষতিকর হবে এমন কথাও ভুল। [4]

দাবি: বিড়ালের লালা খেয়ে ফেললে সমস্যা হয় না অথবা বিড়ালের সাথে এক থালায় খাবার খেলে সমস্যা হয় না?

সত্যতা: বিড়াল ক্ষত স্থান চাটলে যেমন মানুষ রোগাক্রান্ত হতে পারে তেমনি বিড়ালের লালা পেটে গেলেও রোগাক্রান্ত হতে পারে। বিড়ালের লালা থেকে কি কি রোগ হতে পারে সেগুলো পূর্বেই উল্লেখ করেছি।[5]

সোর্স